সালটা ১৯১১। বাংলায় ১৩১৮। কাশীতে চলছে হিন্দু বিশ্ববিদ্য়ালয়ের প্রতিষ্ঠার তোড়জোড়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যত্ এবং কার্যপ্রণালী কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন রিপন কলেজের এক অনুষ্ঠানে। পরবর্তী সময়ে তত্ত্ববোধিনীতে এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বর্তমান সময়ে যে নয়া হিন্দুত্বের রব আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, হিন্দুত্বের অস্তিত্ব জোরালো করতে তৈরি হচ্ছে মন্দির, তেমনই ঠিক একশো বছরে আগে ফিরে গিয়ে দেখা যাক একটি নির্দিষ্ট ধর্মের স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়া নিয়ে কবিগুরু কী মনোভাব পোষণ করতেন।
(প্রবন্ধের কিয়দংশ)
... হিন্দু যে তার স্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছে. এও বর্তমান কালের এই ভাবটি প্রকাশ করছে। এই দেখে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, তাহলে তো মুসলমানের সঙ্গে আমাদের মিলবার আর কোনো পথ থাকবে না। মুসলমানের সঙ্গে হিন্দুর একটা যথার্থ পার্থক্য আছে তা মানতেই হবে। এই অবস্থায় কি করে তাদের সঙ্গে মেলা যায় সেইটেই হচ্ছে প্রশ্ন। একদল বলছেন এই প্রভেদকে একেবারে ঘুটিয়ে দাও, এমন কি নিজেকে হিন্দু বলা পর্যন্ত ত্যাগ করো তাহলেই মুসলমানেরর সঙ্গে এক হয়ে যেতে পারবে। এ কথাটা কি সত্য?
ইংরেজদের সম্বন্ধে একদিন আমরা এই রকম একটা চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলুম। আচারে, ব্যবহারে, আহারে, বিহারে, শয়নে, স্বপনে একদল লোক সাহেবিয়ানার অনুকরণে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল তা সকলেরই জানা কথা। এমন কি আমাদের দেশের একজন বিখ্যাত লোক বিলাতে থাকতে আমি তাঁকে জন ব্রাইটের সঙ্গে এক সভায় বক্তৃতা করতে শুনেছি। সে এমন আশ্চর্য ব্যাপার যে তাঁর পরে ব্রাইট যখন বক্তৃতা করলেন তখন সকলেরই মনে হয়েছিল এমনি কি তফাত্। তিনি যদি পার্লিয়ামেণ্টে ঢুকতেন ত সেখানকার বড় বড় বাগ্মীদের সঙ্গে যে টেক্কা দিতে পারতেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সমস্ত অত্যদ্ভুত ক্ষমতা সত্ত্বেও আমাকে বলতেই হবে তিনি একটা ক্ষণিক বুদ্বুদ মাত্র। আমাদের সমাজ ও সভ্যতার আদর্শকে তিনি নিজের জীবনে উদ্ঘাটিত করতে পারেন নি যার দ্বারা বিশ্বমানব লাভবান হতে পারবো।
সে আদর্শ প্রকাশিত হয়েছে রামমোহন রায়ের মধ্যে। তিনি তাঁর জাতীয়তা থেকে ভ্রষ্ট না হয়েও বিদেশের সমস্ত উচ্চ আদর্শকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং সেই জাতীয়তা সত্ত্বেও ইংরেজ, মুসলমান কারো সঙ্গেই মিলতে তাঁর বাধা হয় নি। রামমোহন রায় যে রকম অন্তরঙ্গভাবে ইংরেজদের সঙ্গে মিশতে পেরেছেন কোনো ইংরেজ-অনুকরণকারীর পক্ষে তা অসম্ভব, অনুকরণকারী স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় ইংরেজের শ্রদ্ধা উদ্রেক করে না ঘৃণা উদ্রেক করে। এ যদি ইংরেজদের সম্বন্ধে সত্য হয় তা হলে আমি যদি নিজেকে হিন্দু না বলি বা আমি যদি মুসলমানের সঙ্গে আমার যা প্রভেদ আছে তা সমূলে উচ্ছেদ করে দি তাহলেই দেশের সমস্ত মৌলবীরা এসে আমার বাড়িতে দাড়ি নাড়তে আরম্ভ করবে এর কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আমাকে কি করতে হবে? না মুসলমানের সঙ্গে আমার যে পার্থক্য আছে তাকে সার্থক করতে হবে। পার্থক্য বজায় রেখে আমাদের সমাজের ভিতরে যে অভিপ্রায়টি আছে তাকে বিকশিত করে তুলতে হবে, তা যদি না করি তা হলে আমরা আত্মহত্যা করবো এবং বিশ্বমানবকেও বঞ্চিত করবো। যদি করি তাহলে দেখবো যে আমরা এমন একটি জায়গায় গিয়ে পৌঁছব যেখানে মুসলমান, ইংরেজ, আফগান সকলের সঙ্গেই আমরা মিশতে পারি।
যেমন ধর বাংলা এবং গুজরাটি ভাষার সম্বন্ধে, বাংলার সঙ্গে গুজরাটির একটা যথার্থ প্রভেদ আছে। আমার ইচ্ছা যে পরস্পর পরস্পরের ভাষার চর্চা করে বুঝতে পারে। তাহলে আমি কি করবো? আমি কি গুজরাটি ভাষাকে কেবল সংস্কৃতবহুল করে তুলে সকলের বোধগম্য করার চেষ্টা করবো? তাহলেই কি সব জাতি গুজরাটি ভাষার অনুশীলন করতে আরম্ভ করবে? না যদি ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের লোকেরা শুনতে পায় যে গুজরাটি ভাষায় খুব চমত্কার একটা সাহিত্য়ের সৃষ্টি হয়েছে তাহলে আমারা উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে? এই সাহিত্যের সৃষ্টি যদি হতে হয় তাহলে কৃত্রিম উপায়ে গুজরাটি ভাষার বিশেষত্বকে ভেঙে দিলে চলবে না, তাকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে দিতে হবে। তারপর সে যদি অপরূপ সাহিত্যের মধ্যে আপনাকে সার্থক করতে পারে ত অভিধান এবং ব্যাকরণের সমস্ত বাধা অতিক্রম করেও গুজরাটি ভাষা শিক্ষা করতে লোকে কুন্ঠিত হবে না। আজ গুজরাটিতে বাংলা বই এত তর্জমা হচ্ছে কেন? না বাংলা এমন একটি সাহিত্য সৃষ্টি করতে পেরেছে যা সহজেই গুজরাটের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছে।
তাহলেই দেখা যাচ্ছে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন আছে।
কিন্তু যাঁরা এই প্রতিষ্ঠানের গঠনভার গ্রহণ করেছেন হিন্দুর কোন্ আদর্শকে তাঁরা সামনে রেখেছেন সেইটেই বিবেচ্য। তাঁরা যদি হিন্দুত্ব বলতে এর নিম্ন এবং সঙ্কীর্ণ অংশটাকেই বোঝেন তাহলে তার প্রতিবাদ করতেই হবে, আমি নিশ্চিয় জানি সত্যের বিরুদ্ধ বলে সে চেষ্টা কখনো সফল হতে পারে না। তাঁরা যদি সত্য এবং ন্যাযের চেয়ে উপরে কেউ তার সমান করে আচারের স্থান নির্দেশ করেন তাহলে বর্তমান হিন্দু সমাজের মত তাঁদের মধ্যেও সত্যের আসন নেবে যাবে। এই স্থানে আমাদের সমাজের অবস্থাটা একবার বিবেচনা করে দেখো। শ্রাস্ত্রে আচারের উপরে বেশি জোর দেওয়াতে সমাজ আজ সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির চেয়ে আচারনিষ্ঠ ব্যক্তিতে বেশী সম্মান দিচ্ছে। অথচ সত্যনিষ্ঠ হওয়ার চেয়ে আচারনিষ্ঠ হওয়া ঢের বেশী সহজ, কাজেই আমাদের সমাজে ব্যক্তির উপরে সত্যের জন্য বিশেষ তাগিদ নেই- আচার রক্ষা হইলেই তার নিষ্কৃতি। তাই আজ বিধবা বিবাহ করলে লোকের জাত যায় আর উন্মুক্ত ব্যভিচার সমাজে অসঙ্কোচে বিচরণ করছে।
বলতে পারো যে, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠন ভার গ্রহণ করেছেন তাঁদের দ্বারা আচারপ্রধান আদর্শই স্থাপিত হওয়া সম্ভব, কিন্তু তা নিয়ে দুঃখিত হলে চলবে না। যাঁরা যে ভাব নেন, তাঁরা সেটার যোগ্য। হিন্দুর উদার আদর্শসম্পন্ন কোনো ব্য়ক্তি যদি এ কাজে অগ্রসর না হন তাহলেই বোঝা যাবে এ কাজের যোগ্য তাঁরা নন।
August 07, 2020 from Ekhon Somoi
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন